free_shipping_English_728x90

পুদুচ্চেরি পর্যটন

Store-banner

Travel to Puducherry in Bengali

পুদুচ্চেরি পর্যটন
* পুদুচ্চেরি পর্যটন মানচিত্রে - পুদুচ্চেরির বিভিন্ন প্রধান শহর, তীর্থস্থান, নদী, পর্যটন কেন্দ্র ও অন্যান্য দর্শনীয় স্থানগুলিকে দেখানো হয়েছে।

পুদুচ্চেরি পর্যটন




ক্ষুদ্র কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচ্চেরি ভারতীয় উপদ্বীপের পূর্বদিকে আচ্ছাদিত রয়েছে। এই ক্ষেত্রটি সমৃদ্ধ অতীতে গর্বিত। কথিত আছে পুদুচ্চেরি প্রাচীণ ঋষি অগস্ত্যের আবাসস্থল ছিল। পৌরাণিক কাহিনী ছাড়াও, এক প্রাচীন দূর্গের ভগ্নাবশেষ ও চোল মূদ্রার আবিষ্কার এটির গৌরবময় অতীতের প্রমাণ দেয়।


১৬৭৩ খ্রীষ্টাব্দে ফরাসিদের আগমনের সাথে সাথে আধুনিক পুদুচ্চেরির ইতিহাসের সূচনা হয়। এটি ১৯৫৪ সালে ভারতীয় ইউনিয়নের একটি অংশ হয়ে ওঠে।


আপনার পুদুচ্চেরি ভ্রমণ হিসাবে এই ক্ষেত্রটি কিন্তু কোনও স্মৃতিস্তম্ভের ভান্ডারের প্রতিশ্রতি দেয় না। এটি সমু্দ্রতীরবর্তী রিসর্ট হওয়া সত্ত্বেও এটি সাধারণত সৈকত রিসর্টগুলি থেকে ভিন্ন। এটি এমন একটি স্থান যেখানে তার ইমারত ও বীথিকাগুলির মধ্যে এখনও ইতিহাসের সাক্ষ্য লক্ষ্য করা যায়। তার প্রাকৃতিক ভূ-চিত্রবৎ নগর ও মনোরম গির্জাগুলির মধ্যে ফরাসি উত্তরাধিকার বেশ প্রকট রয়েছে। মানুষজন এখানকার বাতাবরণের জন্য পুদুচ্চেরিতে ভ্রমণে আসে।

পুদুচ্চেরির জন-পরিসংখ্যান
অবস্থান উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণদিকে তামিলনাড়ু দ্বারা বেষ্টিত, ভারতের দক্ষিণ অংশে বঙ্গোপসাগরের করমন্ডল উপকূলের উপর অবস্থিত।
অক্ষাংশ 11 ডিগ্রী 46 মিনিট থেকে 12 ডিগ্রী 30 মিনিট উত্তরের মধ্যে
দ্রাঘিমাংশ 79 ডিগ্রী 36 মিনিট থেকে 79 ডিগ্রী 52 মিনিট পূর্বের মধ্যে
আয়তন 492 বর্গ কিলোমিটার
জলবায়ু সারা বছর ব্যাপী উষ্ণ
সর্বোচ্চ তাপমাত্রা 31.5 ডিগ্রী সেলসিয়াস
সর্বনিম্ন তাপমাত্রা 23.9 ডিগ্রী সেলসিয়াস
বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত 130 সেন্টিমিটার
রাজধানী পুদুচ্চেরি
জনসংখ্যা 973829
ভাষা তামিল, ইংরাজী, ফরাসি, তেলেগু ও মালায়লম
ধর্ম হিন্দু, খ্রীষ্টান, মুসলিম এবং কিছূসংখ্যক জৈন, শিখ ও বৌদ্ধ
পরিদর্শনের সেরা সময় অক্টোবর – মার্চ
পরিধান সারা বছর ব্যাপী সূতি বস্ত্র


পুদুচ্চেরিতে পৌঁছানোর উপায়




পুদুচ্চেরি নামেও অভিহিত পুদুচ্চেরি, ভারতের দক্ষিণ-পূর্বীয় তটরেখার ওপর অবস্থিত, করমন্ডল উপকূলে আচ্ছাদিত রয়েছে। এই ক্ষুদ্র ভূমিটি একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। একদা ফরাসি উপনিবেশ থাকা, পুদুচ্চেরির একটি সমৃদ্ধ অতীত রয়েছে। তবে, আজকের পুদুচ্চেরি ঋষি অরবিন্দের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত অরভিল্লে আশ্রমের জন্য খ্যাতি অর্জন করেছে। বঙ্গোপসাগরের উৎকলিত জলোচ্ছাস ও সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশ্রিত আধ্যাত্মিক আকর্ষণ, পুদুচ্চেরিকে একটি আকর্ষণীয় গন্তব্যস্থলে পরিণত করেছে।

বিমান মাধ্যমে




পুদুচ্চেরির একটি নিজস্ব বিমানবন্দর রয়েছে যেটি ল্যসপেত-এ অবস্থিত। ক্রমবর্ধিত বিমান যাত্রার চাহিদা পূরণের জন্য ২০১৩ সালের ১৭-ই জানুয়ারী একটি নতুন টার্মিনালের উদ্বোধন করা হয়েছে। এই নতুন টার্মিনালটিতে ব্যাঙ্গালোর ও অন্যান্য প্রধান শহরগুলি পর্যন্ত বিমান পরিকল্পনা সূচী চালু হয়েছে। সাম্প্রতিককালে, স্পাইসজেট হল একমাত্র বিমান-সংস্থা; যা ভায়া ব্যাঙ্গালোর হয়ে পুদুচ্চেরি পর্যন্ত বিমান পরিচালনা করে।

রেল মাধ্যমে




পুদুচ্চেরির নিজস্ব রেলওয়ে স্টেশন রয়েছে; যা ভিলুপ্পুরম ও চেন্নাইতে অবস্থিত পঞ্চ-মুখী জংশন থেকে একটি প্রশস্ত গজ রেলপথ দ্বারা সংযুক্ত। এখানে বেশ কিছু এক্সপ্রেস ট্রেন রয়েছে যেগুলি পুদুচ্চেরিকে অন্যান্য প্রতিবেশী শহর ও রাজ্যগুলির সঙ্গে সংযুক্ত করে।

সড়ক মাধ্যমে




পুদুচ্চেরিতে একটি ভালো সড়ক সংযোগ ব্যবস্থা এবং চমৎকার পরিকাঠমোগত সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে মোট ২৫৫২ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক পথ রয়েছে। রাজ্যটি জাতীয় সড়ক ও রাজ্য সড়কের সঙ্গে সু-সংযুক্ত রয়েছে। পুদুচ্চেরিতে পৌঁছানোর সবচেয়ে সুবিধাজনক উপায় হল চেন্নাই (১৫০ কিলোমিটার) থেকে এবং ব্যাঙ্গালোর (৩০৯ কিলোমিটার) থেকে যাওয়া।

পুদুচ্চেরিতে পরিদর্শনযোগ্য স্থান




পর্যটক ও ভ্রমণার্থীদের শ্বাশত প্রিয় পুদুচ্চেরি, সর্বদাই দেশের অন্যান্য পর্যটন স্থলগুলির থেকে ভিন্ন। প্রায় ৩০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ফরাসিদের দ্বারা শাসিত পুদুচ্চেরি, ফরাসি প্রভাবকে ধারণ করে আছে।


ফরাসিদের দ্বারা নির্মিত বিস্ময়কর ইমারতগুলি আধুনিক ফরাসি স্থাপত্যের গৌরবময় নিদর্শন রূপে চমৎকারভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই শোভনীয় শহরটির মধ্যে ফরাসি ও ভারতীয় সংস্কৃতির মিশ্রণ, একটি গ্রহণযোগ্য সামাজিক পরিকাঠামোকে তুলে ধরেছে। চিত্রোপম ভূ-প্রাকৃতিক দৃশ্যের সঙ্গে যুক্ত এই উপাদানগুলি স্থানটিকে এক আগ্রহদীপ্ত পর্যটন গন্তব্যে পরিণত করে তুলেছে। পুদুচ্চেরিতে বিভিন্ন আকর্ষণের এই উপস্থিতি, ভ্রমণার্থীদের ভীষণভাবে আগ্রহী ও মুগ্ধ করে।

পুদুচ্চেরিতে দর্শনীয় স্থান



  • পুদুচ্চেরিতে মিউজিয়াম।
  • পুদুচ্চেরিতে সৈকত।
  • পুদুচ্চেরিতে মন্দির।
  • ফ্রেঞ্চ ফোর্ট ল্যূইস।
  • আয়ি মন্ডপম।
  • অরবিন্দ আশ্রম।
  • ব্যাক ওয়্যাটার লেক ও গার্ডেন।
  • ঊনবিংশ শতাব্দীর লাইট হাউস।
  • গভর্নমেন্ট পার্ক।
  • স্ট্যাচু অফ ডুপলেক্স।
  • ফ্রেঞ্চ ওয়্যার মেমোরিয়্যাল।



* উপরিউক্ত স্থানগুলির মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য কয়েকটি স্থান সম্পর্কে নীচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।



ফরাসি ফোর্ট ল্যূই





পুদুচ্চেরির এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিস্তম্ভ এবং পুদুচ্চেরির বিভিন্ন আকর্ষণের মধ্যে এক অনবদ্য, পুদুচ্চেরির ফরাসি ফোর্ট ল্যূই, শহরের পর্যটক ও ঐতিহাসিক খামখেয়ালিদের মধ্যে খুবই প্রিয়। পুদুচ্চেরির ফরাসি ফোর্ট ল্যূই, পুদুচ্চেরিতে ফরাসিদের পূর্ব প্রতিষ্ঠান ছিল।


ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, পুদুচ্চেরিতে ফরাসি ফোর্ট ল্যূই ১৭০৯ সাল নাগাদ নির্মিত হয়েছিল। এটি একটি ফরসি দূর্গের শৈলীতে নির্মিত হয়েছিল, যা তথাকথিত বেলজিয়ামে ফরাসির তৌরনাই-তে ভৌবন দ্বারা প্রতিষ্টিত হয়েছিল। চমৎকারভাবে নির্মিত ফরাসি ফোর্ট ল্যূই হল একটি পঞ্চকোণ আকৃতির। এখানে পাঁচটি দূর্গ ও কয়েকটি দ্বার রয়েছে। পুদুচ্চেরির ফরাসি ফোর্ট ল্যূই-য়ের আকর্ষণীয় অংশ হল ভূ-গর্ভস্থ কক্ষ। এই কক্ষগুলি অস্ত্র, গোলাবারুদ ও অন্যান্য পণ্যের ভান্ডারের জন্য তৈরি হয়েছিল।


পুদুচ্চেরির ফরাসি ফোর্ট ল্যূই একটি পরিখা দ্বারা সীমান্তবর্তী রয়েছে। পুদুচ্চেরির ফরাসি ফোর্ট ল্যূই পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে শহরের সিটাডেল বা দূর্গ হিসাবে পরিবেশিত হয় এবং অনেক আক্রমণ ও দুর্যোগের প্রতিরোধ করেছে।



আয়ি মন্ডপম





পুদুচ্চেরির সর্বকালের সেরা প্রিয় সরকারি উদ্যান হল এই শহরের সবচেয়ে এক অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ। এই বিস্ময়কর উদ্যানটির কেন্দ্রে আয়ি মন্ডপম দাঁড়িয়ে রয়েছে। পুদুচ্চেরির আয়ি মন্ডপম হল শহরের এক অন্যতম বিস্ময়কর স্মৃতিস্তম্ভ এবং পুদুচ্চেরির এক অনবদ্য আকর্ষণ।


ঐতিহাসিকদের তথ্য অনুসারে, এটি ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মিত হয়েছিল। আয়ি নামক এক বারাঙ্গনার নামানুসারে এটির নামকরণ করা হয়। তিনি শহরে জল সরবরাহের তাগিদে এক জলাশয় নির্মাণের জন্য তাঁর নিজস্ব বাড়িটি বিনষ্ট করে ফেলেন। সেইসময় তৃতীয় নেপোলিয়ান ফ্রান্সের শাসক ছিলেন। পরবর্তীকালে, ফরাসি কর্তৃপক্ষ এই শহরের প্রতি তাঁর অবদানের কথা স্মরণে রেখে তাঁর নাম অনুযায়ী এটির নামকরণ করেন।


পুদুচ্চেরির চমকপ্রদ আয়ি মন্ডপম হল গভর্নমেন্ট পার্ক বা ভারতী পার্কের জনপ্রিয়তার পিছনে এক অন্যতম কারণ। স্তম্ভটি উদ্যানের কেন্দ্রে রাজকীয়ভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে, এটি দেখতেও চমৎকার। আয়ি মন্ডপম স্মৃতিস্তম্ভটি গ্রেকো-রোম স্থাপত্য শৈলীর সামঞ্জস্যতায় নির্মিত হয়েছিল। উদ্যানের ভিতর ভ্রমণার্থীরা এই বিস্ময়কর স্থাপত্য প্রতিভার উপস্থিতিতে বশীভূত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে সন্ধ্যার সময়, দীপ্তিময় আলোকসজ্জার সাহায্যে সুন্দর দেখায়।


গভর্নমেন্ট পার্কে অবস্থিত, শহরের রাতের আকাশে এক বিশিষ্ট ল্যান্ডমার্ক রূপে দাঁড়িয়ে থাকা উদ্ভাসিত আয়ি মন্ডপম, তার গৌরবময় উপস্থিতিকে সদম্ভে ঘোষিত করে।



আনন্দ রঙ্গ পিল্লাই মিউজিয়াম





পুদুচ্চেরির সুন্দর উপকূলীয় স্বর্গোদ্যান তার সামগ্রিক দৃশ্যের মহাকাব্যজনিত প্রেক্ষাপটের জন্য উল্লেখযোগ্য। সূ্র্য-চুম্বিত শ্বেত বালুকাময়ের বিরুদ্ধে পান্না সমন্বিত সবুজাভ সামুদ্রিক জলের কশাঘাত ছাড়াও পুদুচ্চেরি ইতিহাসের এক ফরাসি উপনিবেশের আবরণ। কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলটির ভূ-প্রকৃতিতে স্থিত উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক ইমারতগুলির মধ্যে, পুদুচ্চেরির আনন্দ রঙ্গ পিল্লাই মিউজিয়ামটি একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে রয়েছে।


আনন্দ রঙ্গ পিল্লাই মিউজিয়ামের ভারতীয় উপমহাদেশে ফরাসি উপনিবেশের প্রাক্তন গভর্নর জেনারেল বা রাজ্যপাল ফ্র্যাঙ্কোয়িস ডুপ্লেক্স-এর প্রসিদ্ধ খেতাব অর্জনকারী হয়ে ওঠার দাবি রাখে। প্রাক্তন রাজ্যপালের মহিমান্বিত দিনগুলিতে, পুদুচ্চেরির পশ্চিম প্রান্তস্থিত এই প্রাচীন স্মৃতিস্তম্ভটি জনপ্রিয়ভাবে “নেটিভ কোয়ার্টারস” বা “স্থানীয় আবাসন” নাম দেওয়া হয়। সমসাময়িক ফরাসি ও ভারতীয় শিরোভূষণের এক চমকপ্রদ মিশ্রণ দ্বারা বর্ণিত এক অত্যাশ্চর্য্য স্থাপত্য, যা সেই যুগের রেওয়াজকে আজও পর্যন্ত পর্যটকদের আকর্ষিত করে।


পুদুচ্চেরিতে অবস্থিত এটি পুদুচ্চেরির রাজ্যপাল বা গভর্নর ডুপ্লেক্স-এর প্রসিদ্ধ শিরোভূষণ ছিল, এইসময় এটি ফরাসি মহিমায় বিস্তার লাভ করে। এছাড়াও “নেটিভ কোয়ার্টারস” নামে পরিচিত, এটি এক অন্যতম প্রাচীণ ইমারত যা পশ্চিম দিকে বিদ্যমান ছিল। সুবৃহৎ অট্টালিকাটিতে ডায়েরী বা দিনলিপির এক সুন্দর সংগ্রহের বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যেটি অষ্টাদশ শতাব্দীর ফরাসি ভারতের তথ্য ভান্ডার হিসাবে পরিবেশিত। আনন্দ রঙ্গ পিল্লাই অট্টালিকাটির স্থাপত্য ফরাসি ও ভারতীয় শৈলীর এক অনন্য মিশ্রণ।


আনন্দ রঙ্গ পিল্লাই মিউজিয়াম পুদুচ্চেরির রাজ্যপাল ডুপ্লেক্সের শিরোভূষণকে পালিত করেছিল, এইসময় এটি ফরাসি মহিমায় প্রস্ফূটিত হয়ে উঠেছিল। পিল্লাই-য়ের ডায়েরী বা দিনলিপিগুলির সম্পূর্ণতা অষ্টাদশ শতাব্দীর ফরাসি ভারতের তথ্য ভান্ডার হিসাবে উপস্থাপিত হয়।


তাঁর অট্টালিকাটি, ১৭৩৮ সালের কোনও এক সময় সম্পন্ন হয়, এটি পশ্চিম দিকের এক অন্যতম প্রাচীন ইমারত, পরবর্তীকালে এটি “নেটিভ কোয়ার্টারস” নামে পরিচিতি পায়। এটির স্থাপত্য ফরাসি ও ভারতীয় শৈলীর এক অদ্ভূত মিশ্রণের প্রতিনিধিত্ব করে।



অরবিন্দ আশ্রম





মহান দেশপ্রেমিক, জাতীয়তাবাদী, আধ্যাত্মিক নেতা ও গুরু – শ্রী অরবিন্দ ঘোষ তাঁর জীবনের আধ্যাত্মিক জাগরণের দিনগুলি পুদুচ্চেরিতে কাটিয়েছিলেন। এই মহান ভাবুক ব্যাক্তি বিশ্বের এই অংশে এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে, আজও পর্যন্ত তিনি একই উৎসাহের সঙ্গে আরাধিত ও সম্মানিত হন।


পুদুচ্চেরির অরবিন্দ আশ্রম, যেটি জননেতা নিজেই তৈরি করেছিলেন, যেখানে প্রতি বছর লাখ লাখ অনুগামী ও ভক্তরা পরিদর্শনে আসে। আশ্রমটি একটি তীর্থকেন্দ্রের মর্যাদা অর্জন করেছে এবং পুদুচ্চেরির এক অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হিসাবে উদিত হয়েছে।


পুদুচ্চেরির অরবিন্দ আশ্রম, এই কেন্দ্রশসিত অঞ্চলটির সম্ভাব্য সর্বাধিক পরিদর্শনমূলক পর্যটন স্থল হয়ে উঠেছে। শ্রী অরবিন্দ ও মায়ের আবাসটি তাঁদের পুদুচ্চেরিতে সাময়িক নিবৃত্তির সময়, ১৯২৬ সালে নির্মিত হয়েছিল। অরবিন্দ আশ্রম নিবন্ধিত ট্র্যাস্ট দ্বারা পরিচালিত হয়। আশ্রমের বিস্তীর্ন এলাকা হল দেড় হাজার সদস্যের বাসভবন। সারা দেশ থেকে এবং বিশ্বের সমস্ত প্রান্ত থেকে আগত মানুষজন শ্রী অরবিন্দ সোসাইটি-তে সদস্যপদ গ্রহণ করেছেন।


আশ্রমের প্রধান ভবনটি ঘন সবুজ বৃক্ষ দ্বারা পরিবেষ্টিত, প্রাঙ্গনের পাশেই আচ্ছাদিত রয়েছে। স্থানটি সুন্দর ফুলের বাগান দ্বারা বিভূষিত, যার কেন্দ্রে সমাধি অবস্থিত। পুদুচ্চেরির নির্মল অরবিন্দ আশ্রম, উৎসবের সময় জেগে ওঠে। হাজার হাজার পর্যটক, অনুগামীবৃন্দ ও ভ্রমণার্থীরা এই স্থান পরিদর্শনে আসেন। বিপূল জমায়েত হওয়া সত্ত্বেও, সদস্যরা ভবনের অভ্যন্তরে নিয়মশৃঙ্খলা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে বজায় রাখতে সক্ষম হন।



ব্যাক ওয়্যাটার লেক এবং গার্ডেন





পুদুচ্চেরির পর্যটন প্রসঙ্গে কথা উঠলে, এখানে সৌন্দর্য্যময় পর্যটন স্থলের কোনও ঘাটতি নেই। শান্তিপূ্র্ণ তবুও উদ্দীপক সমুদ্র সৈকত, অতীতের ঔপনিবেশিক স্মৃতিবেদনা জড়িত স্মৃতিস্তম্ভ ও পুদুচ্চেরির ব্যাক ওয়্যাটার লেক এবং গার্ডেন হল পুদুচ্চেরির প্রধান আকর্ষণ।


পুদুচ্চেরির ব্যাক ওয়্যাটার লেক এবং গার্ডেন সম্পর্কে কথা উঠলে, নির্দিষ্ট কয়েকটি জায়গার নাম উল্লেখ করা প্রয়োজন; সেগুলি হল –

  • বোটানিক্যাল গার্ডেন।
  • দ্য গভর্নমেন্ট পার্ক বা ভারতী উদ্যান।
  • চুনাম্বর ব্যাকওয়্যাটার।
  • কেজহুর।



নিউ বাস স্ট্যান্ডের দক্ষিণদিকে অবস্থিত, বোটানিক্যাল গার্ডেন হল প্রকৃতিপ্রেমী ও সবুজায়নের সক্রিয় কর্মীদের জন্য ভীষণ আকর্ষণীয়। তাছাড়াও এটি তার বর্ণময় পুষ্প শয্যা, পাথর ও নুড়িপাথর সমন্বিত সারিবদ্ধ পথ ও অভুতপূর্ব বৃক্ষের সাথে সাধারণ পর্যটকদেরও আকর্ষিত করে। সুরেলা ঝর্ণাগুলি শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের একইভাবে পরিতৃ্প্ত করে তোলে। ভারতী পার্ক তার সবুজাভ তৃণভূমির দীর্ঘ প্রসারণ সহ পুদুচ্চেরি শহরের ফুসফুস রূপে পরিবেশিত হয়। এই সু-পরিচর্যিত উদ্যানটি কৃত্রিম পর্বতমালা, বিভিন্ন ধরনের গাছপালা, পুকুর ও গ্রানাইট পাথরে নির্মিত বেঞ্চের সঙ্গে সুশোভিত হয়ে উঠেছে। এটি একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় পিকনিক স্থল।


চারশত বছরের পুরনো বট বৃক্ষের উপস্থিতির জন্য কেজহুর নামক গ্রামটি পরিচিত। পুদুচ্চেরির কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের সবচেয়ে এক অন্যতম জনপ্রিয় এলাকা চুনাম্বর ব্যাকওয়্যাটার, প্রধান শহরের খুব সান্নিধ্যেই অবস্থিত। চুনাম্বর ব্যাকওয়্যাটার এলাকা বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম; যেমন – ইয়্যাচটিং, বোটিং, সান্ বাথিং ইত্যাদির জন্য একটি আগ্রহদীপ্ত স্থল। ক্রীড়া প্রেমীরা, খেলার সংস্থানের সঙ্গে এখানে বীচ্ ভলি, সমু্দ্র সৈকতে হর্স রাইডিং (ঘোড়ায় চড়া) এবং আরোও অনেক কিছুতে উৎসবমুখর হয়ে উঠবে। অনেকে প্রীতিকর ডলফিনদের দর্শক মনোরঞ্জনকারী কেরামতির দৃশ্যও দেখতে পারেন। এককথায়, যারা আনন্দ করতে ভালোবসেন তাদের এই স্থানটি পরিদর্শন করা আবশ্যক।



ঊনবিংশ শতাব্দীর লাইট হাউস





শহরের সবচেয়ে পরিদর্শীত পর্যটন স্থান, পুদুচ্চেরির ঊনবিংশ শতাব্দীর লাইট হাউস, গোরিমেদূতে অবস্থিত রেড হিলস-এর ওপর চমৎকারভাবে দন্ডায়মান। শহরের পশ্চিমী সীমান্ত থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত পুদুচ্চেরির ঊনবিংশ শতাব্দীর লাইট হাউস, পুদুচ্চেরির আকর্ষণগুলির মধ্যে অন্যতম।



আরিয়াঁকূপ্পম আর্কিওলোজিক্যাল সাইট





পুদুচ্চেরির ক্রান্তীয় স্বর্গোদ্যান, জ্ঞানী পন্ডিতদের তাদের আধ্যাত্মিক ক্ষুধা মেটানোর প্রবণতার জন্য এক স্বপ্ন পূরণকারী গন্তব্যস্থল। কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলটি, পূর্বকালীন ফরাসি ঔপনিবেশের যুগবাহিত ইতিহসের মধ্যে অবগুন্ঠন হয়ে উঠেছে। আরিয়াঁকূপ্পম প্রত্নতাত্ত্বিক স্হানটি হল একটি ঐতিহাসিক সম্ভ্রান্ত স্থান যেটি পুদুচ্চেরির ইতিহাসে একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে রয়েছে। একজন কিংবদন্তী জ্যোর্তিবিজ্ঞানী গুইল্যিউম ল্যে জেন্টিল সময়ের ঘূর্ণাবর্তে ১৭৬৮-১৭৭১ সালের মধ্যে কোনও এক সময়, পুদুচ্চেরির এই ক্ষুদ্র উপকূলীয় কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলটির পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। পরিদর্শনের সময়, কিছু জীর্ণ দেওয়াল, ইঁটের ঢিপি এবং আরিয়াঁকূপ্পম নামে অভিহিত একটি উদ্ভট নগরের মধ্যে কিছু আদিম কূয়োঁর জীর্ণ ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে তাঁর হঠাতই সাক্ষাৎ হয়, এই আরিয়াঁকূপ্পম নগরটি পুদুচ্চেরি থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে একটি ঢিঁল ছোড়া দূরত্বে অবস্থিত। এটি জ্যোর্তিবিজ্ঞানীর দূরকল্পী মস্তিষ্কের অনুসন্ধিৎসাকে জাগিয়ে তুলেছিল। তার সন্দেহ সঠিক প্রমাণ করে এবং প্রত্নতাত্ত্বিক খননকে দ্রুত সুনিশ্চিত করে, যা এক প্রাচীন গ্রামের ভগ্নাবশেষ।


আরিয়াঁকূপ্পম প্রত্নতাত্ত্বিক স্হানে বহুকাল আগেই ১৯৪০ সালে খনন করা হয়েছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক স্হানের উত্তর সীমান্তের এক পুঙ্খানুপুঙ্খ অন্বেষণে ইঁট গুদামের ধ্বংসাবশেষ বেফাঁস হয়ে যায়, অন্যদিকে দক্ষিণের অঞ্চল বেশ কিছু জলাধার ও জল নিষ্কাশন নালী (ড্রেন) সহ বেশ কিছু প্রাচীন প্রাঙ্গনের উন্মোচন করে। মৃৎশিল্পের ধ্বংসাবশেষের এবং অন্যান্য ভারতীয় তথা ভূমধ্যীয় কিছু হস্তনির্মিত দ্রব্যের কয়েকটি টুকরো পুনরাবৃত্ত খননের দ্বারা উন্মোচিত হয়। অর্ধ মূল্যবান পাথর, পুঁতি এবং প্রাচীন রোমান হস্তনির্মিত দ্রব্য যেমন ওয়াইন (মাদক) ও সশের বয়াম ও বহু সংখ্যক জিনিসের সৌন্দর্য্য একটি গুপ্ত সংকেতকে উন্মোচন করে।



পুদুচ্চেরির গভর্নমেন্ট পার্ক





পুদুচ্চেরি এক প্রাচীন ফরাসি উপনিবেশ হওয়ায়, ফরাসি আস্বাদনের সারাংশ অপরিবর্তিত রয়েছে, যেখানে ফরাসি-শৈলীর ঔপনিবেশিক স্থাপত্য স্পষ্টরূপে পরিলক্ষিত হয়; যা এই দর্শনীয় ভারতীয় কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলটিকে পরিবেষ্টিত ও বিভূষিত করে রেখেছে। পুদুচ্চেরির গভর্নমেন্ট পার্ক, এই অপরিহার্য ফরাসি স্থাপত্য প্রতিভার এক সক্রিয় বাহক।


পুদুচ্চেরি, বেশ কিছু অতীব সৌন্দর্য্যমূলক উদ্যান ও বাগিচার সাথে সজ্জিত একটি অত্যন্ত সু-পরিকল্পিত ও সু-পরিচর্যিত শহর, যেখানে আপনি যে কোনও সময় যেতে পারেন। পুদুচ্চেরির গভর্নমেন্ট পার্ক একটি অত্যাশ্চর্য্য ও শিল্পরুচিসম্মত বিনোদনমূলক উদ্যানের একটি অত্যাধুনিক উদাহরণকে তুলে ধরে, এটি তার বিহ্বল নির্মলতা দ্বারা এখানে ভ্রমণে আসা ব্যস্ততাহীন পর্যটক ও ভ্রমণার্থীদের মুগ্ধ করে।


পুদুচ্চেরির গভর্নমেন্ট পার্ক যথাযোগ্যভাবে প্রাচীন ঔপনিবেশিক শহরের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে অবস্থিত। এই অনন্য উদ্যানটির উৎপত্তির তাৎপর্য্যমূলক ঘটনা হল যে এটি বেশ কিছু সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ সরকারি ভবন; যেমন লেফটেনেন্ট গভর্নরের প্রাসাদ, বিধানসভা ক্ষেত্র, সরকারি হাসপাতাল, আশ্রম ভোজনশালা, সার্কেল ডি পুদুচ্চেরি প্রাইভেট ক্লাব ও প্রাচীন হোটেল কোয়্যালাইট দ্বারা পরিবেষ্টিত রয়েছে।


পুদুচ্চেরির এই সরকারি উদ্যানটি কেবলমাত্র ঘন সবুজাভ তৃণভূমি ও একটি অসাধারণ বাগানের পূষ্পশোভিত চিত্র অনুপম সৌন্দর্য্যই প্রদান করে না, বরং এখানকার নিবেদিত পুনুরুজ্জীবিত ও প্রাণবন্ততায় প্রমত্ত বাতাবরণ এটিকে শান্তিময়তার জন্য এক আদর্শ জায়গা হিসাবে গড়ে তুলেছে। সস্নেহে পুদুচ্চেরির ভারতী উদ্যান নামেও সুপরিচিত এই গভর্নমেন্ট পার্ক আপনার কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলটিতে থাকাকালীন এক অতি আবশ্যক পরিদর্শনীয় স্থান।



ফরাসি ওয়্যার মেমোরিয়াল





পুদুচ্চেরির কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলটি বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য ফরাসি স্মৃতিরক্ষাকারী ইমারতের দ্বারা সন্দেহাতীতভাবে প্রদর্শিত হওয়ায় এখানে একটি শক্তিশালী ফরাসি সংযোগ বিদ্যমান রয়েছে, পুদুচ্চেরিতে তারই একটি জ্বলন্ত উদাহরণ হল ফরাসি ওয়্যার মেমোরিয়্যাল। বিভিন্ন ধরনের স্মৃতিস্তম্ভ, স্মারক ও অন্যান্য ঐতিহাসিক ইমারতগুলি উপকূলীয় কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের সামগ্রিক দৃশ্যের সৌন্দর্য্য বৃদ্ধিতে একটি গুরুত্বপূ্র্ণ ভূমিকা পালন করে। এগুলির মধ্যে, আড়ম্বরপূর্ণ ও ঐশ্বর্যশালী ফরাসি ওয়্যার মেমোরিয়ালটি পুদুচ্চেরির এক অন্যতম স্থাপত্য বিস্ময় রূপে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। গৌবার্ট এভ্যিনিউ নামে অভিহিত একটি সুন্দর বিহারে অবস্থিত, ফরাসি ওয়্যার মেমোরিয়ালটি সাহসী সংগ্রামীদের সম্মানে নির্মিত হয়েছিল, যাঁরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁদের জীবন বলিদান দিয়েছিলেন।


ফরাসি ওয়্যার মেমোরিয়াল ও পুদুচ্চেরি পর্যটনের একটি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হল ১৪-ই জুলাই অনুষ্ঠিত ব্যাস্টিল দিবস উৎসব, এইসময় স্মৃতিস্তম্ভটি তার শ্রেষ্ঠ ভঙ্গিতে সুসজ্জিত ও আলোকিত হয়ে ওঠে। উৎসবের সমারোহ ও জাঁকজমকতা আকুল ভাবপ্রবণতা ও স্মৃতিবেদনার সাথে রঞ্জিত হয়ে পড়ে, যা পর্যটকদের মনে স্বদেশপ্রেমের উদ্রেক করে।


পুদুচ্চেরি বর্তমানে ভারতের এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিলাষী পর্যটন গন্তব্যস্থল। সমুদ্রতীরের অদ্ভূত কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলটি প্রাচীন ইতিহাসের আবরণে লুকিয়ে রয়েছে এবং ফরাসি সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের ছাপ এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।


শৌর্য্যপূর্ণ যোদ্ধাদের এক যথার্থ সমর্থনে, পুদুচ্চেরির ফরাসি ওয়্যার মেমোরিয়াল, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ঐতিহ্যের অন্য আরেকটি আলোচ্য বিষয়বস্তু।



ডুপ্লেক্স-এর মূর্তি





পুদুচ্চেরির কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলটি একটি প্রাচীন ফরাসি উপনিবেশ হয়ে উঠেছিল এবং তার ঔপনিবেশিক অতীতের ছাপ পোষণ করে চলেছে। পুদুচ্চেরির স্ট্যাচু অফ ডুপ্লেক্স, অপরিহার্য ফরাসি সংযোগের যথাযোগ্যভাবে বর্ণনারূপে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলটিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে।


মহান ফ্রাঙ্কোয়েস ডুপ্লেক্স- এর খ্যাতির অনেক দাবী রয়েছে। ভারতের ফরাসি সভ্যতার প্রাক্তন গভর্নর জেনারেল, বাংলার ভাগ হওয়ার পিছনে অনুমিত প্রধান পরিকল্পক রবার্ট ক্ল্যাইভ-এর এক অন্যতম বিবাদী ছিলেন। ডুপ্লেক্স একজন দক্ষ প্রশাসক ছিলেন যিনি ১৭৫৪ সাল পর্যন্ত কার্যালয়ে ছিলেন। বিদ্রুপাত্মকরূপে, যদিও তিনি মহিমা, স্বীকৃতি ও সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছানোর বহুদিন পর ১৭৮০ সালে তাঁর কর্মজীবনের শেষ হয়, সেইসময় তাঁর অক্লান্ত সেবার একটি সপ্রশংস স্বীকৃতি প্রদান করতে দুটি মূর্তি ফ্রান্স ও পুদুচ্চেরিতে প্রতিষ্ঠিত করা হয়।


মূ্তির্টি গর্বিতভাবে মাথা উঁচু করে আধ ডজনেরও বেশি ২.৮৮ মিটার উঁচু সুসজ্জিত স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। প্রাথমিকভাবে পুদুচ্চেরির স্ট্যাচু অফ ডুপ্লেক্স, প্লেস দু রিপাবলিকে অবস্থিত ছিল। সেখানে থেকে এটিকে বর্তমান স্থানে স্থানান্তরিত করে আনা হয়, যেটি এক চিত্র অনুপম স্থান যেখান থেকে এক সুন্দর ও বর্ণময় শিশুদের উদ্যান পরিলক্ষিত হয়, যা শিশুদের খেলার সময় তাদের উচ্ছ্বসিত কলরবে উজ্জীবিত থাকে। উদ্যানটি, এক দীর্ঘ ও সুপরিচর্যিত বীথিকার দক্ষিণী প্রান্তসীমায়, গৌবার্ট এভ্যিনিউ নামক জায়গায় অবস্থিত। পুদুচ্চেরি ভ্রমণ পর্যটকদের ফরাসি সংযুক্ততা ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের ছাপের সঙ্গে উজ্জীবিত ইতিহাসের সারিবদ্ধতার মাধ্যমে পর্যটকদের হৃদয়ঙ্গম করে তোলে।



স্ট্যাচু অফ জোয়ান্ অফ আর্ক





পুদুচ্চেরির কেন্দ্রশসিত অঞ্চলটি চিত্র অনুপম প্রাকৃতিক ভূ-দৃশ্যে আশীর্বাদিত রয়েছে। এছাড়াও পূর্বেকার ফরাসি উপনিবেশ ঐতিহাসিকগতভাবে এখানে আচ্ছাদিত রয়েছে যা এখানকার বিভিন্ন ঐতিহাসিক মূ্র্তির দ্বারা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়; এরই একটি যথার্থ নমুনা হল স্ট্যাচু অফ জোয়ান্ অফ আর্ক।


স্ট্যাচু অফ জোয়ান্ অফ আর্ক, কেন্দ্রশসিত অঞ্চলের রাজধানী পুদুচ্চেরি শহরে বিখ্যাত ফরাসি মহিলা জিয়ান্নেদ আর্ক-এর শ্রেষ্ঠ জয়োল্লাসের প্রতিকৃতি হিসাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে এই চিত্রানুরুপ নগরটিকে পরিলক্ষন করছেন। আজ তিনি ল’ঈগলাইস দ্যি নটর ডেম্ দেস এঞ্জেস-এর সম্মুখে এক পরিচর্যিত বাগিচায় সুন্দরভাবে মহিমান্বিত মার্বেলের প্রতিকৃতি হিসাবে লম্বাভাবে দণ্ডায়মান।


পঞ্চদশ শতাব্দীর সময়কালে বসবাসকারী ফরাসি অগ্রবর্তী দলের মধ্যে সুপ্রসিদ্ধ জোয়ান্ অফ আর্ক এবং তার অসাধরণ সাহস ও বীরত্বের জন্য উল্লেখযোগ্য। খ্রীষ্ট-ধর্মে প্রবলভাবে বিশ্বাসী, তাঁর ধার্মিক আত্মা, পরাক্রমশীলতার পুনরাবৃত্ত দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা জাগৃত ছিল। তীব্রভাবে অনুপ্রাণিত, তিনি ইংরেজদের খপ্পর থেকে তাঁর দেশকে উদ্ধারে, খুবই তৎপরতার সাথে প্রতিক্রিয়া জানান।


এক রণ ভঙ্গ বিপ্লবী, জোয়ান্ অফ আর্কের সাহস ও আত্মবিশ্বাস অপরাজিতভাবে রয়ে গেছে; এমনকি তিনি যখন যুদ্ধক্ষেত্রে গুরুতরভাবে আহত হন, তখনও তিনি তার পরাক্রমশীলতার পরিচয় দেন। কোমপিয়েন-এর কাছে এক মৃত্যুজনক দ্বন্দ যুদ্ধে তিনি আত্মসমর্পন করেন। একটি অত্যন্ত কূটনৈতিক ফন্দি ও জটিল সংবর্তের পর জোয়ান্ অফ আর্ককে বৈধর্ম্য ও অশুচি বা অপবিত্রকরণের গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়।


অবশেষে, তৎকালীন পোপ অন্যায্য রায়দান পরিবর্তিত করেন, কারণ তাঁর জোয়ান্ অফ আর্কের পবিত্রতা ও সুনামের উপর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল। আরও ২৪ বছর পর জোয়ান্ অফ আর্ক শহীদ হয়ে ওঠেন এবং তাঁর পথ ভঙ্গ কার্য-কলাপ অনেকের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। অবশেষে ১৯০৯ সালে তিনি স্বনামধন্য হয়ে ওঠেন এবং প্রায় এক দশক পর ১৯০৯ সালে তাঁকে প্রদত্ত সন্ত-এর মর্যাদা দেওয়া হয়।

পুদুচ্চেরিতে কার্যক্রম




আপনি যদি বর্হিমুখী ধরণের হন, তবে এটি আপনাকে অনেক কিছুই নিবেদন করতে পারে। অধিকাংশ কীর্তিকলাপ সমুদ্র-সৈকতের সান্নিধ্যে দেখা যেতে পারে। আপনি বলিতে হাঁটাচলা করতে পারেন, সমুদ্রে সাঁতার কাটতে পারেন, সূর্যাস্ত দর্শন করতে বা রিভার ক্রুজ করতে পারেন। আপনি চূনাম্বর নদীর বুকে বোটিং বা নৌকাচালনার জন্য এবং এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার জন্যও যেতে পারেন। সমু্দ্রের বুকে ডলফিনদের উৎসাহিত জলকেলিও অতীব দর্শনীয়।


ফরাসি আবাসনের ঐতিহ্যবাহী ইমারত ও প্রশস্ত সড়কপথের চারপাশে কেবল হাঁটাচলার অনুভূতি গ্রহন করুন। সমুদ্রের সম্মুখে প্রমোদ-বিহার, ফরাসি দূতাবাস দেখুন, দক্ষিণে গেলে, পুরনো পুদুচ্চেরিতে আপনি অতীত যুগের অভিজ্ঞতা লাভ করবেন।

পুদুচ্চেরিতে কেনাকাটা




পুদুচ্চেরিতে কেনাকাটা হল একটি বাস্তবিক আনন্দ যেহেতু এটি শুল্ক-মুক্ত গন্তব্যস্থল। স্বাভাবিকভাবে এখানে আপনার কেনাকাটার মূল্য অনেক কম। পুদুচ্চেরিতে হস্তশিল্পের কোনও স্থানীয় ঐতিহ্য নেই। বর্তমানে পুদুচ্চেরির অরবিন্দ আশ্রম কারখানা প্রচুর জিনিষপত্রের উৎপাদন করে, যেমনঃ মোমবাতি, ধূপকাঠি, কাগজ ইত্যাদি; যা স্থানীয় বিশেষত্ব হয়ে উঠেছে। এগুলি পর্যটকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় এবং পুদুচ্চেরিতে ভালো কেনাকাটার জন্য তৈরি।

পুদুচ্চেরিতে হোটেল




এখানে হোটেলের কোনও অভাব নেই। এখানে আপনার বাজেট অনুযায়ী, আপনি পছন্দের অনেক বিকল্প পেতে পারেন। বিলাস-বহুল শোভনীয় হোটেল, মধ্য-মানের হোটেল, বাজেট হোটেলে থাকার ব্যাবস্থাও রয়েছে। এছাড়াও, আপনি উপযুক্ত বিকল্প হিসাবে অরবিন্দ আশ্রমও দেখতে পারেন; যেখানে থাকা আরামদায়ক ও দামও তুলনামূলকভাবে কম।


যদিও এখানে প্রচুর হোটেল রয়েছে, তবুও আপনার হোটেলের রুম অগ্রিম সংগ্রহ করে রাখুন। যেহেতু এটি একটি উষ্ণ ও আর্দ্র গন্তব্যস্থল, তাই হোটেলের সমস্ত কক্ষগুলি শীততাপ নিয়ন্ত্রিত হওয়ায়, পর্যটকদের সেখানে কোনও সমস্যা হবে না।

পুদুচ্চেরির রন্ধ্রনপ্রণালী




এখানে আপনি মনোহর রান্নার আশা করতে পারেন। এটি একটি খুবই অনন্য স্থান যেখানে আপনি ফরাসি ও তামিল রন্ধ্রনপ্রণালীর মিশ্রণ পেতে পারেন। অতি সূক্ষ ও মশালাদার সুস্বাদু খাবার আপনাকে আরোও ক্ষুধার্ত করে তুলবে। খাবারের ইন্দো-ফরাসি প্রণালী, ভিন্ন সংস্কৃতির মিশ্রণের দরুণ বিভিন্ন অনন্য ও সস্বাদু খাবারের জন্ম দিয়েছে। এখানকার বিশেষত্ব- সব্জির তরকারি, নারিকেলের তরকারি, সোয়া ধোসা, ইতালীয় পক্ক মটর, আসাদ, তন্দুরি আলু, স্টাফড্ বাঁধাকপি, পোড়াঁলঙ্গকাল ও আরোও অনেক কিছুই আপনার পছন্দ হবে। তাছাড়াও, এখানকার স্থানীয় রেস্তোঁরাগুলিতে বিভিন্ন ধরনের প্রকৃতিজাত ও মূলগত খাবারও উপলব্ধ রয়েছে; যেগুলি আপনার ভালো লাগবে।


এটি এমন একটি স্থান যেখানে আপনি ফরাসি প্রণালীতে তৈরি মুখরোচক ফরাসি ব্যগেট্টে, বিওচে, কেক, ব্রেড ও প্যাস্ট্রির স্বাদ নিতে পারেন।

* সর্বশেষ সংযোজন : ২৯ - শে জুন, ২০১৫